Friday, October 7, 2022
HomeStoryদেওয়ানী দত্ত শাসন ও বাংলা দুর্ভিক্ষ

দেওয়ানী দত্ত শাসন ও বাংলা দুর্ভিক্ষ

                           দেওয়ানী দত্ত শাসন ও বাংলা দুর্ভিক্ষ

(ক) বক্সারের যুদ্ধ:

বক্সারের যুদ্ধের পটভূমি :

মীর কাসিম একজন দক্ষ প্রশাসক দৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ও স্বাধীনচেতা লোক ছিলেন। দেশ ও জাতির কল্যাণে জনতার গৃহীত পদক্ষেপের ফলে কোম্পানির সাথে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

বক্সারের যুদ্ধ:

ইংরেজি অধ্যক্ষ কর্তৃক পাটানা দখলকে কেন্দ্র করে মীর কাসিম ইংরেজদের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। মীর কাসিম ঘটনা পুনর্দখল এবং সেখান থেকে বিতাড়িত করলে ক্ষুব্ধ কলকাতা কাউন্সিল নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। অযোধ্যার নবাব সিরাজউদ্দোল্লাহ মীর কাসেমকে সহায়তা করতে সম্মত হন। ১৭৬৪ সালে বক্সার নামক স্থানে সম্মিলিত বাহিনীর সাথে ইংরেজ বাহিনীর ঘোরতর যুদ্ধ হয় যুদ্ধে সম্মিলিত বাহিনী ইংরেজদের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।

বক্সারের যুদ্ধের ফলাফল ও গুরুত্ব:

বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের পর বাংলা তথা ভারতের ইংরেজ কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুনিশ্চিত হয়। এ যুদ্ধের পর ইংরেজদের ক্ষমতা হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য এবং তাদের রাজকীয় ক্ষমতার কাছাকাছি এসে পৌঁছায়।

(খ) কোম্পানির দেওয়ানি লাভ ও ফলাফল:

বক্সারের যুদ্ধের পর মির্জাপুর পুনরায় বাংলার নবাব। তিনি নবাব হলেন বটে কিন্তু তার কোনো ক্ষমতা রইল না ‌। পূর্বে সম্রাটের প্রতিনিধিরূপে সুবাদরের দুই রকমের ক্ষমতা ছিল। এর একটি হলো তেমনি অর্থাৎ রাজস্ব শাসন ক্ষমতার একটি হলো ফৌজদারি ও তার সামরিক বা আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষমতা। মির্জাপুর প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর ইংরেজদের অবাধ বাণিজ্যের সুযোগ দিয়েছিলেন।

কোম্পানি সনদ লাভ:

১৭৬৫খ্রিস্টাব্দে রবার্ট ক্লাইভ দ্বিতীয়বার বাংলার গভর্নর হিসেবে এদেশে আসেন। ইতিপূর্বে তিনি এদেশে ইংরেজদের কর্তৃক স্থাপনে পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন। দ্বিতীয়বার ও কার্য ক্ষমতা গ্রহণ করে তিনি তাদের প্রত্যক্ষ কর্তৃক বিস্তারের প্রথম উম্মুক্ত করেন।

ফলাফল:

বাংলা তথা ভারতে ইংরেজদের এ দেওয়ানি লাভ ইংরেজ প্রভুত্ব স্থাপনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দেওয়ানি লাভ এর ফলে কোম্পানির সমগ্র দেশের রাজস্ব আদায়ে ব্যয় গ্রহণ করে। শাসন সংক্রান্ত ব্যয় নির্বাহের জন্য কোম্পানির নবাবকে ৫৩ লাখ টাকা দিতে স্বীকৃত হয়। সার্বিক আদায়কৃত রাজস্ব হতে দিল্লির সম্রাট ও বাংলার নবাবের নির্ধারিত অর্থ প্রদানের পর অর্থ অবশিষ্ট থাকত তা কোম্পানি নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ব্যয় করার অধিকার লাভ করে।

(গ) ক্লাইভ দ্বিতীয়বার উপমহাদেশের আগমন করে প্রশাসনিক সংস্কার মনোনিবেশ করে। ভারতীয় উপমহাদেশের শাসনব্যবস্থা সরকারি গ্রহণের ভয়াবহ গুরুত্ব অনুভব করে তিনি দত্ত শাসন নীতি প্রবর্তন করেন। এ শাসনব্যবস্থা তিনি দেশীয় নবাবের উপর বিচার ও শাসন বিভাগের দায়িত্ব অর্পণ করে কোম্পানির ওপর রাজস্ব ও দেশ রক্ষার দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। জনসাধারণের মধ্যে যাতে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি হতে না পারে সেজন্য তিনি কোম্পানির পক্ষ হতে রেজা খান কে বাংলার এবং সেতাব রাইকে বিহারের রাজস্ব আদায়ের জন্য নায়েব নাজিম নিযুক্ত করেন। মূলত তারা নবাবের অধীনে হলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তাবেদার হিসেবে উপক্রম পালন করতেন।

 

ক্লাইভের দত্ত শাসন নীতি ইংরেজ কর্মচারীদের অত্যাচারের উৎপীড়ন শ্বসনের ফলে বাংলা জনসাধারণের অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। বাংলা অর্থনৈতিক দুরবস্থা লক্ষ্য করে সকলকে বলেন এরূপ নিষ্ঠুর শোষণ ও উৎপীড়ন বাংলার মানুষ কোনদিন দেখেনি

দত্ত শাসন এর ত্রুটি:

রবার্ট ক্লাইভ প্রস্তাবিত দ্বৈত শাসনব্যবস্থা মোটেই দোষমুক্ত ছিল না এই শাসন ব্যবস্থা চালু হলে প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দেয় রাজ্যশাসনের নায়েককে দায়িত্ব দেয়া হলেও তাকে কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি অপরদিকে কম্পানি লাভ করে দায়িত্বহীন ক্ষমতা যার কোনো জবাবদিহিতা ছিল না লক্ষ্য করে ঐতিহাসিক রাজ্যে প্রথম থেকে 10 আসনের ব্যর্থতা ছিল সুনিশ্চিত।

দ্বৈত শাসনের কুফল:

দত্ত শাসন দেশের কল্যাণ প্রশ্ন ছিল না। এতে একদিকে নবাবের ক্ষমতাহীন দায়িত্ব অন্যদিকে ইংরেজদের দায়িত্বহীন ক্ষমতা দেশের জন্য বিপদ ডেকে আনে। এরূপ উদ্ভট ব্যবহারের ফলে দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড অচিরে ভেঙে পড়ে। অভাবের তাড়নায় দেশের মধ্যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়। এমারত দুর্ভিক্ষ ইতিহাসের ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত।

(ঘ) বাংলার দুর্ভিক্ষ:

দেশবর্তব্দ দ্বৈত শাসনের কুফল এবং কোম্পানির আমলাদের উৎপীড়নের ফলে বাংলার অবস্থা শোচনীয় হতে থাকে। পলাশীর যুদ্ধের পর হতে দেশের সম্পদ কমতে থাকে অথচ রাজস্বের হাট প্রতিবছর বাড়তে থাকে এতে জনগণের অর্থনৈতিক জীবনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
বাংলার এমন ঘর দুর্দিনে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের অনাবৃষ্টি খড়া দারুন শস্য নষ্ট হয়ে চরম খাদ্যের অভাব দেখা দেয় জনগণ এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয়। চালের দাম বেড়ে টাকায় তিন শের হয়। তাও কোম্পানির লোকদের অশুভ হস্তক্ষেপের ফলে দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে। বাংলাবাজারে খাদ্যশস্য কোম্পানির লোকেরা গুদামজাত করে পরে চড়া দামে বিক্রি করতো দেশের প্রায় সর্বত্র অনাহারে মৃত্যুর দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। কোম্পানির রিপোর্ট অনুযায়ী এ দুর্ভিক্ষে প্রায় ১০ মিলিয়ন বা 1 কোটি মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ লোক অনাহারে ও পীড়ায় মৃত্যুবরণ করে।

বাংলার এমন দুর্দিনে সরকার নির্বিকার থাকে। অবশেষে বিভিন্ন জেলার লং কারখানা খোলা হয় কিন্তু তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য অথচ রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ঠিক রাখা হয়। বাংলার দুর্ভিক্ষের কারণে কৃষকের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায় বউ সম্ভ্রান্ত পরিবারের সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেন এ দুর্ভিক্ষের প্রতিক্রিয়া বাংলার প্রায় 20 হতে 25 বছর পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল বাংলা ১৭৭৬ দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়েছিল বলে নামে এ অভিহিত করা হয়।

আরও পড়ুনঃবাংলাদেশের জমিদার ও প্রজাব্যবস্থা

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments